নদী
নদী
এসেছিলাম কেরালার শহর
থিরুবন্তপুরম এ একটা মামুলি কনফারেন্সে। আগামীকাল কনফারেন্স শুরু। আমি পৌছেছি
দুপুরের পরে। জিনিসপত্র ঘরে রেখে এসে ক্যন্টিনে এসে চা খাচ্ছিলাম।
ঠিক সমুদ্রের ধারেই ক্যন্টিন। বিকেল
বেলায় সুর্য সমুদ্রের ধারে ঢলে পড়েছে। একটা সোনালী রঙের চাদরে সমুদ্রটা যেন ঢাকা
পড়ে গেছে। চায়ের কাপ হাতে উদাস দৃষ্টিতে সমুদ্রের রূপ দেখছিলাম, এমন সময় আমার
টেবিলের উলটো দিকে একজন এসে বসল।
প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ার বয়স
অনেকদিন পেরিয়ে গেছে। তবে সমুদ্রের ধারে এই উদাসী বিকেল বেলায় উল্টোদিকের মেয়েটির
চোখে চোখ পড়তেই মনে হল সে যেন আমার অনেক অনেক দিনের চেনা – আর হয়ত তারও একই রকম
মনে হল। নাহলে কোন ভূমিকা না করেই সে বলে উঠবে কেন –
“আমার নাম নদী।”
বলার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল – “নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?”
খিল খিল করে হাসির ঝর্ণা বয়ে গেল
যেন – “শুরু করেছিলাম জলপাইগুড়ি থেকে,
তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজ আর IIT Bombay
ভায়া হয়ে এখানে আসছি।”
“কনফারেন্সে এসেছ?” আমি বললাম।
“হ্যাঁ। তুমিও নিশ্চয়ই একই
কাজে?”
“হ্যাঁ। আমার নাম সুমন। আমি SINP থেকে। ন্যনোটেকনলজি।”
“আমিও ন্যনোতে। তোমার
প্রেজেন্টেসেন কখন?”
“পরশু সকাল 10-30 তে।”
“আমার পরশু বিকেল সাড়ে তিনটেয়।
আচ্ছা, কাল তো শুধুই লেকচার আছে, তাই না।”
“হ্যাঁ, দেশ বিদেশ থেকে সব
প্রফেসর রা আসবেন, আর আমাদের জ্ঞান দেবেন।”
“আমি তো লেকচার শুনতে শুনতে
শুধুই ঘুমিয়ে পড়ি। বাই দ্য ওয়ে – তোমার কি M. Sc ফিজিক্স?”
“হ্যাঁ” আমি বললাম – B. Sc বাঁকুড়া খ্রিষ্টান কলেজ, তারপর M. Sc বর্ধমান ইউনিভার্সিটি –
“আমি প্রেসীডেন্সি তে B. Sc, তারপর IIT Bombay তে M. Sc করে আপাতত ওখানেই PhD করছি।”
আমার একবারও মনে হলনা যে আমাদের
আজই আলাপ .....................
বিকেলটা খুব সুন্দর কেটে গেল।
সুর্য প্রায় অস্ত যাবে যাবে। নদী বলল – “চল একটু সমুদ্রের ধারে যাই।”
হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। জোয়ার
আর ভাঁটার মাঝামাঝি সময়। সমুদ্র অনেক শান্ত। ঢেওয়ের প্রবল হুঙ্কার এখন নেই – নিজের
ভারে সমুদ্র যেন নিজেই ক্লান্ত হয়ে আজকের মত সুর্যকে বিদায় জানাচ্ছে।
“সমুদ্রের সামনে এলেই আমার
নিজেকে ঐ সমুদ্রের ধারের পাথরগুলোর মত মনে হয়। মনে হয় আমি ঘুমিয়ে আছি, আর ঢেউগুলো
যেন ঠিক মায়ের হাত হয়ে গিয়ে এক-এক বার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আবার দূরে
দূরে সরে যাচ্ছে – ” নদী কেমন একটা উদাস হয়ে গিয়ে বলল।
সুর্য তখন প্রায় ডুবে এসেছে।
আকাশে লাল হলুদ বেগুনীর খেলা। সমুদ্রে গাঢ় লাল আর বেগুনী যেন শঙ্খচূড়ের শঙ্খের মত
পরস্পরের সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। বললাম – “মায়ের জন্য মন খারাপ করছে?”
নদী একটু হাসল। হাসির মধ্যে চাপা
ব্যথা লুকিয়ে আছে কি? আমি প্রশ্ন করে বসলাম – “তোমার মা কি জলপাইগুড়ি তেই আছেন?”
আকাশের গায়ে তখন সন্ধ্যাতারা
ফুটে উঠেছে – নদী আকাশের দিকে হাত তুলে দেখাল – “ঐ যে আমার মা – দেখতে পাচ্ছ?”
আমি কিছুই বলতে পারলাম না। এমন
অবস্থায় কিছু বলারও থাকে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। আস্তে আস্তে গাঢ় অন্ধকার নেমে
আসল।
বেশ কিছুক্ষন পর নদী হালকা
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল – “একটু ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম। চল ফেরা যাক।”
আমি আবারও বেশী কিছু বলতে পারলাম
না। শুধু “চল” বলে গেষ্ট হাউসের দিকে পা বাড়ালাম।
ডিনারের সময় আবার দেখা হল।
কলেজের গল্প – বন্ধু বান্ধবীদের মধ্যে কত মজার মজার ঘটনা - ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে বলতেই খুব সুন্দর
সময় কেটে গেল।
আমার সঙ্গে SINP থেকে আর কোন বন্ধু বান্ধব আসেনি। নদীও একাই এসেছে। আর বাকি
বিশেষ কারও সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে হল না। দু-দিনেরই তো ব্যপার।
পরদিন কনফারেন্স শুরু হল। আমরা
পাশাপাশিই বসলাম। যথারীতি একটু পরেই ঘুম ঘুম পেতে লাগল। নদীর দিকে তাকিয়ে দেখি –
ওমা, অলরেডি ঘাড় কাত করে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েছে। ভাল- আমিও একটু ঝিমিয়ে পড়লাম।
লাঞ্চ টাইমে নদী বলল – “হেভি
ঘুমালাম বুঝলে।”
“আরে আমিও দারুন ঘুমিয়েছি। এত
সুন্দর এ.সি চলছিল – কি আরাম!” মুরগীর ঠ্যাংটা
কামড়াতে কামড়াতে বললাম আমি।
“সেই। এবার খেয়ে দেয়ে আরেক
প্রস্থ হবে।”
“হুম্ম্” আমি খেতে খেতে বললাম।
“আমার কালকের প্রেজেন্টেসনের জন্য এক-আধটু দেখতে হবে।”
“আরে ও ঠিক হয়ে যাবে। চাপ নিও
না, জীবনে প্রেজেন্টেসন কি কম দিয়েছ নাকি!”
“আরে ধুর চাপ নেব কেন, আমি ভাবছি
তুমি বোধহয় ভুলেই গেছ কালকের প্রেজেন্টেসনের কথা।”
খেতে খেতেই মুচকি হেসে চোখ টিপল
নদী।
জানি না সেই চোখের মধ্যে কি ছিল
– মনে হল , আমি বিশাল বড় এক ফাঁকা মাঠের মধ্যে
পাশ ফিরে শুয়ে আছি – একটু দূরে বেগুনী
ঘাসফুল ফুটেছে, আর হাওয়ার সাথে সাথে দুলে দুলে হাতছানি দিয়ে আমায় ডাকছে।
সন্ধ্যাবেলায় লেকচার শেষ হবার পর
আবার গেলাম সমুদ্রের ধারে। সমুদ্রে ঢেউ একটু বেশী। আমার মনও কি একটু বেশী চঞ্চল?
“জান, অনেকদিন ভেবছি, কেন বেঁচে
থাকব? কেন মরে যাবনা?” নদী বলল।
“Conclusion কি?” আমি বললাম......।
“এই জন্যই বেঁচে থাকব, কারন
জীবনে অনেক সময় অনেক ভাল অনুভূতি, অনেক ভাল feelings পাওয়া যায়। এই feelings গুলো কখন আসবে আগে থেকে বোঝা
যায় না, কিন্তু যখন আসে, খুব ভাল লাগে.........। এই যেমন এখন তোমার সঙ্গে সমুদ্রের
ধারে দাঁড়িয়ে আছি, অসাধারন ভাল লাগছে...। এর জন্যই তো বেঁচে থাকা......।”
“দারুণ বলেছ। আমিও এরকমই কিছু
ভেবেছিলাম......।”
আমার প্রচুর ইচ্ছা করছিল হাত
দিয়ে নদীর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে কাছে টেনে নিই, আর গালে একটা আলতো চুমু খাই। কিন্তু
ব্রিটিশ ও রাবিন্দ্রিক রক্ষণশীলতারই জয় হল। আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়েই রইলাম।
পরেরদিন আমাদের দুজনেরই
প্রেজেন্টেশন ঠিকঠাক হয়ে গেল। আমার ট্রেন রাত্রি ন’টায়, নদীর সাড়ে দশটায়।
ব্যাগ গুছিয়ে সন্ধ্যাবেলায় আবার আমরা
সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে......।
বিদায়ের সময় এসেছে। অনেক বার
অনেকের থেকে বিদায় নিয়েছি। এবার মনে কি বেশী ব্যথা?
“নদী, আমাকে নিয়ে যাবে?”
“কোথায়?”
“সমুদ্রে...।”
“আমার সঙ্গে, আমার স্রোতে ভেসে
ভেসে?”
“হ্যাঁ।”
“আর তুমি যে রাস্তায় চলছিলে তার
কি হবে?”
“আমার রাস্তা আর তোমার স্রোত,
দুটোকে মিলিয়ে নতুন রাস্তা খুজে নেওয়া যাবে.........।”
“আমি নদী।”
“আর আমি ক্লান্ত পথিক......।”
“পথিক চলার পথে নদীতে নামে কয়েক
মুহূর্তের শান্তির জন্য। নদীতে ভেসে যায় না...। নদী নিজের মত চলতে থাকে......।”
“আমি কি তোমাকে বাঁধতে পারি না?”
“না......। পার না......।”
“আমি কি সমুদ্রেও যেতে পারি
না.........?”
“পার, তোমার নিজের পথে......। আর
সেই পথে বিশ্রামের জন্য তুমি অনেক আশ্রয় পাবে......। কখনও বা আমাকেও পেতে পার,
আমিও তো সমুদ্রেই যাচ্ছি......।”
“সমুদ্রে তো আমাকে যেতেই হবে
নদী, পথও আমাকে নিজেকেই খুজে নিতে হবে......। তখন তো তোমাকে আলাদা করে খুজে পাব
না......।”
“সমুদ্রের মাঝেই আমি মিশে থাকব।
এক আঁজলা জল তুলে নিও, আমাকে দেখতে পাবে......।”
“সে দিন তো আসবেই নদী.........
আজকের মত বিদায়.........।। তবে একা চলে যেও না.........আমার কয়েকফোঁটা চোখের জলও নিজের
সাথে নিয়ে যাও ............।”
খুব ভালো লাগল।
ReplyDelete