আমার ছেলেবেলা
আমার ছেলেবেলা
আমার জন্ম হয়েছিল জঙ্গলের তাজা হাওয়া, কালবৈশাখীর ঝড়ে নুইয়ে পরা লম্বা
ইউক্যালিপটাস গাছ, দুপুরবেলায় পুকুরে ঝাঁপ, সদ্য জমি থেকে তুলে আনা শাক সবজির
মাঝখানে। আমাদের গ্রাম অন্য সব গ্রামের থেকে আলাদা ছিল। নাম -উপরডাঙ্গা। বন্যায়
ডুবত না বলেই এই নাম। উত্তরে
রবীন্দ্রনাথের লাল মাটির দেশ, দক্ষিণ আর পূর্বে বর্ধমানের উর্বর ধানজমি, পশ্চিমে
দেবী চৌধুরানীর জঙ্গলমহল। আমাদের গ্রাম বেশী বড় ছিল না। পূর্বপ্রান্তে ব্লক
হাসপাতাল আর তার গুটিকয়েক কোয়ার্টার দিয়ে গ্রামের শুরু। তারপর প্রাইমারি স্কুল। স্কুলের
পশ্চিমে হাসপাতালের পুরনো রিটায়ার হওয়া কয়েকজন কর্মচারী, ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়ি
করে এখানেই রয়ে গেছেন। তারপর কিছু সাধারন চাষি, ব্যবসায়ী আর রাজমিস্ত্রি পরিবারের
বাস। আর একদম
শেষে, গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে আমাদের বাড়ি। গ্রামের পিছনেই আদিবাসী পাড়া। ওদের পরবের
সময় বেশ ভাল নাচগান হত, দারুন লাগত দেখতে।
আমদের বাড়ির সামনে একটা শিউলি গাছ ছিল। শরতের সকালে রোজ সন্ধ্যাবেলায় ফুরফুরে
বাতাসের সঙ্গে শিউলি ফুলের গন্ধ্যে ঘর ভরে যেত। আর সকালে দেখতাম ঘরের সামনে লাল
সাদা শিউলি ফুলের চাদর। দিদা শিউলি ফুল খুব ভালবাসতেন। বলতেন শিউলি ফুল ঘর শান্ত
করে। তা শুধু আমাদের বাড়ি কেন, ব্রাহ্মন,
চাষা, ডোম, মুসলিম, সাঁওতাল, সবাই মিলেমিশে খুব শান্তিতেই থাকতাম আমরা।
আমার বাবা হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। স্কুলের নাম ভাতকুন্ডা হাইস্কুল। বাবার
স্কুল আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে ছিল। আমি যখন ছোট তখন ভাতকুন্ডা
যাবার ভাল রাস্তা ছিল না, মাঝে একটা ছোট নদী ছিল যেটা হেঁটে পেরতে হত। বাবা রোজ
সাইকেল মাথায় তুলে নদী পেরতেন।
আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে দুটো ক্লাসরুম, মাস্টারও দুজন। একটা ঘরে ওয়ান
আর টু এর ক্লাস হত, আরেকটায় থ্রী আর ফোর এর। মনে পড়ে, সেই সুর করে কবিতা পড়তাম-
“আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে”।
উপরডাঙ্গার পশ্চিমে এক কিলোমিটার গেলে পড়ে বননবগ্রাম। সেখানেই আমাদের হাইস্কুল
আর পোষ্ট অফিস। জ্যেঠতুতো দাদার কল্যানে ক্লাস ফাইভে ওঠার অনেক আগে থেকেই আমার
বননবগ্রাম হাই স্কুলে যাতায়াত ছিল। এখনও বাড়ি গেলেই একবার স্কুলটাকে অবশ্যই দেখে
আসি।
ক্লাস টেন পর্যন্ত আমি বননবগ্রাম হাই স্কুলেই পড়েছি। স্কুলের ঘটনা বলা শুরু
করলে রাত কাবার হয়ে যাবে। সময় বড় কম। তাই সংক্ষেপে সারছি।
ছোটবেলার বন্ধুত্বগুলো খুব সহজ ছিল। ঝগড়া, মারামারি – আবার কালকে গলায় গলায
ভাব। কখনো কিছু ভাবতে হত না। স্কুলের প্রায় সবাই সবাইকে চিনত। সবাই মিলে সরস্বতী
পুজোয় খিচুড়ি রান্না করা আর চুরি করে বোঁদে খাওয়া – উফফফ অসাধারন!
বয়ঃসন্ধির বছরগুলতে কাউকে ভাল লাগেনি বললে বলা ভুল হবে। আমার জুনিয়র একটি
মেয়েকে একবার বেশ ভাল লেগেছিল। বলাই বাহুল্য যে তার আমাকে পছন্দ ছিল না, এবং এই
কাহিনীর এখানেই ইতি।
আমার ক্লাসের একজন আমাকে পছন্দ করত। আমি বুঝেও বুঝিনি। তাকে আমার প্রেমিকা
হিসেবে কোনদিনও কল্পনা করতে পারিনি আমি। তাই এই গল্প শুরু হবার আগেই শেষ হয়ে যায়।
এভাবেই আমি মাধ্যমিক ( 10th
standard ) পাস করে যাই। ক্লাসের
পড়ার থেকে গল্পের বইটাই বেশী পড়তাম। শরৎচন্দ্র, সুকান্ত আর সত্যজিৎ রায় ছিলেন আমার
মাধ্যমিক জীবনের সবথেকে প্রিয় লেখক। রবীন্দ্রনাথ ভালভাবে পড়েছি কলেজ জীবনে।
ক্লাস নাইনে ওঠার পর বাবা মাঝে মাঝে চেঁচাত বটে- “এই এত
গল্পের বই পড়ছিস কেন?” আমি যেন শুনতেই
পেতাম না...............।
মাধ্যমিক এ যতটা আশা করেছিলাম তার থেকে বেশ কিছুটা কম নম্বর পেয়েছিলাম। তাতে
অবশ্যি একদিনের বেশি দুঃখ থাকেনি। অনেক বেশি দুঃখ পেতে হত যদি উচ্চ মাধ্যমিকে
ভুলভাল কোন স্কুলে ভরতি হতাম।
আমার গ্রাম থেকে জেলা সদর বর্ধমান বাসে প্রায় ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা। আমি উচ্চ
মাধ্যমিক ( 12th standard ) বর্ধমান CMS স্কুলে
পড়েছি। সদ্য গ্রাম থেকে সদর শহরে আসলে যেকোন ছেলে মেয়ের-ই কিছু সমস্যা হয়। আমি
ব্যাতিক্রম ছিলাম না। তবে আস্তে আস্তে মানিয়ে নিয়েছিলাম। বর্ধমানের দু বছর আমার
জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। অনেক কিছু শিখেছি, জেনেছি, আর সবথেকে বড় কথা হল
কয়েকজন lifetime বন্ধু পেয়েছি, যাদের
সঙ্গে কথা বলার সময় মুখের আগে একটা ফিল্টার লাগাতে হয় না।
ক্লাস ইলেভেনটা আমি এক দাদা বৌদির সঙ্গে ছিলাম। দাদার দুই ছেলেমেয়ে। গল্প করে,
খেলে, ক্লাস ইলেভেনটা ভালই কেটেছিল। প্রাইভেট টিউশন নির্ভর পড়াশুনা, স্কুলে যেতে
হত সপ্তাহে তিন দিন, প্রাকটিকেল ক্লাস করার জন্য। বর্ধমানের প্রায় কোন স্কুলেই টিচাররা
কিছু পড়াতেন না। বাড়িতে টিউশন পড়াতেন। সরকার দেখেও না দেখার ভান করত।
ক্লাস ইলেভেনের সবথেকে বড় ঘটনা হল সঞ্জীব আর শ্যামলীদিকে বন্ধু হিসাবে পাওয়া।
আজ এরা দুজনেই আমার থেকে অনেক অনেক দূরে, কিন্তু ভালবাসা ? এখনও যেমনকার তেমনিই
আছে।
ক্লাস টুয়েলভে বাবা মা বোনকে নিয়ে বর্ধমানে চলে আসেন। আমরা একটা ঘরভাড়া নিয়ে
থাকতে শুরু করি।
বাড়ির মালিক এর সঙ্গে আমাদের প্রায় আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়ে গেছিল। কাকু কাকিমা
মানুষ হিসাবে খুব ভাল ছিলেন। এবং আমার দেখা সবথেকে happy couple দের মধ্যে একজন। সঞ্জীব রোজই আসত। প্রচুর আড্ডা, কম্পিউটার
গেমস, তাস খেলা ইত্যাদি হত। বর্ধমানের শেষ বছরটা খুব ভাল কাটিয়েছি।
ক্লাস এইট থেকেই আমার Physics এর উপর Interest তৈরি হতে থাকে। Nature এর Basic Law গুলো
যে Physics পড়লে যানা যেতে পারে সেটা আমার মাধ্যমিক স্কুলের স্যার
নববাবু আর স্বর্গীয় পান্নাবাবু বুঝিয়েছিলেন। তাই উচ্চ মাধ্যমিকে সবাই যখন ডাক্তারি
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য Joint Entrance,
IIT Entrance ইত্যাদি পরীক্ষা দেবার
চেষ্টা করছে, আমি দিব্যি আনন্দে নিজের ইচ্ছামত গল্পের বই, পপুলার সায়েন্সের বই
পড়ছি।
এভাবেই উচ্চ মাধ্যমিকও পাশ করে গেলাম। ভালই নম্বর পেয়েছিলাম। আমার ক্লাস থেকে
চার জন একসঙ্গে ভর্তি হলাম যাদবপুর ইউনিভার্সিটির Physics Department এ । আর তারপরেই শুরু হল নতুন এক জীবন।
Lekhar style ta valo laglo. Tobe aro lomba kore chai lekha ta ke. Banglai ki kore likhte hoi jani na. Tai Inragi tei likhlam bangla ta.
ReplyDelete@ Anupam........Avro keyboard download kore install kor.......nijei sikhe jabi........ar dekha jak...bhobisyot je JU er kotha lekhar ichcha ache..........
ReplyDeletekoi amdr kotha toh lekhoni....:P:P.. huh
ReplyDeleteHummmmm......likhechilam koyek line.....abar ki bhebe delete kore dilam.....jak, pore ekta choto golpo likhe debo.......
Deleteamader kotha likhbei ba kno??? amra thodi valo bondhu chilm..jara valo bondhu chilo tader naam ullekh kora ache... :)
DeleteEta aro egok... bhalo lagche porte !!
ReplyDelete@sandipan ....Dekha jak....pore jodi abar likhte pari.....apatata etukui likhechi......
Deleteboss!!! hoyto amake chinte parbi na... ektu smriti ke pressure dile 2005batch CMS -e khuje pabi. Jai hok, lekha ta mono mughdho kar. keu fully open hearted na hole ebhabe likhte pare na. tui chaliye ja... aager kahini tar jonno opekkhay roilam.
ReplyDeleteBhai,toke amar jothesto mone ache.....asole prai kaukei puropuri bhule jai ni.....tobe regular contact khub kom joner songei ache..... Lekhar kotha jodi bolis to bolbo, ekhane bisesh bandhu nei, jedin eka eka lage sedin ek adthu lekhar chesta kori ar ki......Nischoi abar likhbo......!
DeleteThis comment has been removed by the author.
ReplyDelete