নতুন জীবন
মোহিনী
অন্ধ্রপ্রদেশের
এক প্রত্যন্ত গ্রাম কাডাল্লা। বছর পঁচিশেক আগে সেখানেই জন্মেছিল মোহিনী।
নাম
মোহিনী হলেও মোহিনী সুন্দরী ছিল না। অন্ত্যত ভারতীয় সিনেমাজগৎ সুন্দরীদের যে Definition তৈরী করেছে সেই হিসেবে নয়।
মোহিনী
খুব গরীবের ঘরে জন্মায়নি। জন্মালে এই গল্প হয়ত কোনোদিনও লেখা হত না।
মোহিনীর
বাবা থিরুম্মা বাবু সরকারি কর্মচারী। বদলির চাকরি, এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতে হয়।
খানিকটা ভাগ্যের জোরেই মোহিনীর জন্মের সময় তিনি বাড়ির কাছাকাছি পোষ্টিং পান। জীবনের
প্রথম দশ বছর মোহিনী নিজের গ্রামেই কাটায়।
সেটা
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। বিশ্বায়নের
হাওয়া তখনও ভারতবর্ষে ভাল ভাবে পৌঁছায়নি। শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে জঙ্গলঘেঁষা
কাডাল্লায় দারিদ্র বেশ প্রবল।
স্কুলে
মাঝে মাঝেই মোহিনী দেখত তার কোন সহপাঠী বা সহপাঠিনী হয়ত খেয়ে আসেনি। কেউ বা পুরনো
ছেঁড়া জামা পরে আসত। মোহিনী জিজ্ঞ্যেস করত –
“খাসনি
কেন?”
বন্ধুটি
হয়ত বলত – “ঘরে চাল নেই”
সাত-আঠ
বছরের মোহিনীর জীবনের জটিলতা বোঝার সময় তখন হয়নি। কিন্তু তার মনে একটাই প্রশ্ন
জন্মাত – আমি দিব্যি খেয়ে আসছি, কিন্তু ও খেয়ে আসছে না কেন?
ক্লাস
ফাইভের পর মোহিনীরা জেলা সদর মুকুন্ডায় চলে আসে। মোহিনী জেলা স্কুলে ভর্তি হয়। আর
পাঁচটা শহুরে মধ্যবিত্ত ছেলে মেয়ের মতই তার জীবন কাটতে থাকে।
ক্লাস
টুয়েলভ পাস করে মোহিনী বিশাখাপত্তনমের এক নামী কলেজে ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি
হয়। ডাক্তারি পড়তে না পারার দুঃখ একটা ছিল বটে, কিন্তু স্কুলে ফিজিক্স তার খুব
একটা খারাপ লাগত না।
সেটা
২০০৫-০৬ সাল। দীর্ঘ দু-দশক একটু চুপচাপ থাকার পর ভারতবর্ষে নকশালি বা মাওবাদীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আর মাওবাদীদের ছাত্র
সংগঠনও তখন ভালই সক্রিয়। এতদিন রাজনীতি বা ঐ জাতীয় কোনো প্রকার জটিল জিনিস নিয়ে
মাথা না ঘামানো মোহিনী নিজেকে এই প্রবল প্রবাহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারল না।
একদিন
ক্যন্টিনে চা খেতে খেতে এক সিনিয়র দাদা প্রশ্ন করল – “আচ্ছা তুমি কি জানো যে
ভারতবর্ষের শতকরা পঞ্চাশ ভাগের বেশী মানুষ দিনে দুবেলা ভাল করে খেতে পায় না?”
মোহিনীর
মনে পড়ে গেল তার ছোটোবেলার বন্ধুদের কথা। বলল – “আইডিয়া করতে পারছি।”
“কেন
এরকম অবস্থা, কিছু ধারণা করতে পার?”
“আমমমম.....”
আমতা আমতা করে বিশেষ কিছু বলতে পারল না মোহিনী।
“তার
কারণ এই যে, দেশের শতকরা ২ পারসেন্ট মানুষ দেশের অর্ধেকের বেশী সম্পত্তি দখল করে
রেখেছে, আর কোনোভাবেই সেই অর্থ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। সুতরাং
একটা বড় অংশের মানুষ খেতে পাচ্ছে না, পড়াশুনা করতে পারছে না, শুধু কোনরকমে ধুঁকতে
ধুঁকতে বেঁচে আছে।”
আর
পিছন ফিরে তাকাতে হল না। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন – এ যৌবন জলধিতরঙ্গ রোধিবে কে? –
মোহিনী নবযৌবনের আবেগে ভেসে গেল।
বছর
দুই পরের কথা। মোহিনী ততদিনে একজন সম্ভাবনাময় ছাত্রনেত্রী হয়ে উঠেছে। তার জীবনের
একমাত্র উদ্দেশ্য যে এই ঘুণ ধরা সমাজকে সম্পুর্ণ রূপে ভেঙ্গে চুরে আবার নতুন করে
প্রথম থেকে গড়ে তোলা, সে বিষয়ে তার আর কোন সন্দেহ নেই। এমন সময় একদিন এক গোপন
মিটিংএ বক্তৃতা দিতে এলেন কয়েক বছর আগে পাশ করা সিনিয়র কমরেড কৃষ্ণান।
ছাত্রমহলে
কৃষ্ণান বিখ্যাত তাঁর বক্তৃতার জোর আর চমকপ্রদ পার্সোনালিটির জন্য। লম্বা সুঠাম
চেহারা আর গমগমে গলায় সহজেই সবাইকে আকৃষ্ঠ করতে পারেন তিনি। বয়সও ত্রিশের নিচেই।
খুবসাধারণ ভাবেই প্রথমদিনেই মোহিনী তাঁর প্রেমে পড়ে গেল।
কৃষ্ণানও
অনেকদিন ধরেই এরকম একজন কাউকে খুঁজছিলেন। একজন তরুন ছাত্রী যে ‘রণে বনে জঙ্গলে’
সবসময়ই তাঁর পাশে থাকবে। মোহিনী তখনও কুড়ির কোঠা পেরয়নি। কিশোরীর চোখের ভাষা বুঝতে
অসুবিধা হলনা কৃষ্ণানের। কয়েকমাসের মধ্যেই ‘ফর্মাল’ প্রপোজ ইত্যাদি হয়ে গেল।
কয়েকমাস
ভালই কাটছিল। মোহিনী জানত যে তাদের সামাজিক বিয়ে হয়ত কোনদিন হবে না। যে কোনদিন কৃষ্ণানকে
‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ চলে যেতে হতে পারে, আর সে নিজে সমাজের মধ্যে থেকেই ছাত্র ও
মহিলা ফ্রন্টে কাজ করবে।
কিন্তু
মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। হঠাৎ একদিন মোহিনীকে গোপন মিটিংএ ডেকে পাঠানো হল।
মোহিনী, কৃষ্ণান, আর একজন বয়স্ক কমরেড।
“মোহিনী”,
বললেন বয়স্ক কমরেড - “এই মিটিঙের এজেণ্ডা তোমাদের পার্সোনাল জীবন, বুঝতেই পারছ।”
“হ্যাঁ
কমরেড, পারছি।”
“দেখ,
আমি যে কথাগুলো এখন বলব, সেগুলো তোমাদের জীবনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
তুমি প্রস্তুত?”
“হ্যাঁ,
কমরেড।”
“আমাদের
আন্দোলনে আগামী ভবিষ্যতে তুমি এবং কৃষ্ণান, দুজনেই খুব বড় ভূমিকা পালন করতে চলেছ।
তুমি নিশ্চয়-ই চাইবে তোমরা তোমাদের ১০০ পারসেন্ট এফিসিয়েন্সি দিয়ে কাজ কর।”
“হ্যাঁ,
কমরেড।” একই ভাবে উত্তরদিল মোহিনী।......কৃষ্ণান এখনও চুপচাপ।
“গুড।
কিছুদিনের মধ্যেই কৃষ্ণানকে এমন কিছু করতে হবে যার পর অন্ত্যত কয়েক বছরের জন্য ওর
পক্ষে স্বাভাবিক মানুষের মত জীবনযাপন করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। মানে
‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ চলে যেতে হবে।”
“হ্যাঁ,
এমনটা তো হবারই ছিল” হালকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল মোহিনী।
“রাইট।
কিন্তু কৃষ্ণান চায় যাবার আগে তোমাকে বিয়ে করে যেতে।”
“অ্যাঁ?”
অবাক হয়ে চোখে প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে কৃষ্ণানের দিকে তাকাল মোহিনী।
“হ্যাঁ,
মোহিনী”, প্রথম কথা বলল কৃষ্ণান। “যদিও লজিকালি আমাদের বিয়ে করার খুব বেশী প্রয়োজন
নেই, এটা শুধু আমার নিজের Mental Satisfaction এর জন্য,
আমার নিজের একটা আশ্রয় আছে, এই কথাটা আমার নিজের মনে গাঁথা হয়ে থাকার জন্য।”
“তোমাদের
বিয়ের কথা পার্টি-কমরেডরা ছাড়া কেউ জানবে না”, বললেন বয়স্ক কমরেড। কয়েকবছর পর
কৃষ্ণান ফিরে এলে তোমরা সংসার করতে পার। আর যদি কৃষ্ণানকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ ই
থেকে যেতে হয়, তাহলে তখন তুমি ঠিক করবে যে তুমিও ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ যাবে, না
সমাজের মধ্য থেকে কাজ করবে। ইন দ্য সেকেন্ড কেস, তোমাদের রেগুলার দেখা হবে না,
বুঝতেই পারছ।”
বিয়ের
কথা আগে মোহিনী কখনও ভাবে নি। তাই এই প্রস্তাবে একটু হকচকিয়ে গেল সে। বয়স্ক কমরেড
আর কৃষ্ণান মিলে তাকে বোঝাল যে তাদের বিয়ে টা তাদের আন্দোলনের পক্ষে, এবং
সামগ্রিকভাবে আগামীদিনের বিপ্লবের পক্ষে কতটা জরুরি।
কয়েকদিন
ভেবে অবশেষে মত দিল মোহিনী। বেশ কিছু দূরের এক শহরে মাত্র কয়েকজন সিনিয়র কমরেড এর
মাঝখানে খুব সাদামাটা ভাবেই রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হয়ে গেল মোহিনীর। আর তারপর? বাকিটা
আমরা একটু পরে শুনব......।
....................................................................................
দীপক, মোহিনী ও তারপর
দিল্লীর
ছেলে দীপক ছোটবেলা থেকেই ফিজিক্স ভালবাসত। ইঞ্জিয়ারিং না পড়ে নিজের ইচ্ছাতেই
কিরোরিমল কলেজে ফিজিক্স পড়েছিল সে। B. Sc পাশ করে
IIT খড়গপুরে M. Sc পড়তে আসে সে। IIT তে ফার্স্ট ইয়ার আর সেকেন্ড ইয়ারের মাঝে তিন মাস সময় দেওয়া
হয় সামার প্রজেক্ট করার জন্য। অন্য কথাও না গিয়ে সে IIT দিল্লীতেই এলো প্রজেক্ট করার জন্য। বাড়িতে ছুটি উপভোগ করাও
হবে, আর এক আধটু কাজ করাও হবে।
IIT থেকে
দীপকের বাড়ি একটু দুরেই ছিল। তাই দীপক সিদ্ধান্ত নিল যে IIT -র হোস্টেলেই থাকবে, সপ্তাহের শেষে বাড়ি যাবে। ওদিকে college- এর বন্ধু রাহুলও এসেছিল প্রজেক্ট করতে। দুই
বন্ধু মিলে প্রথম কয়েকদিন বেশ ভাল ভাবেই কাটাল।
কয়েকদিন
পর একজন নতুন মেয়ে এল প্রজেক্টে। খুব সাধারন চেহারা, কিন্তু চোখে মুখে দৃঢ়তা আছে।
দেখে সাউথ ইন্ডিয়ান মনে হয়।
দীপক
নিজেই গিয়ে আলাপ করল। - “তোমার নাম কি?”
“মোহিনী।
তোমার?”
“দীপক।
তুমি সাউথ ইন্ডিয়ান?”
“হ্যাঁ।
অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। তুমি?”
“আমার
বাড়ি দিল্লীতেই। তবে এখান থেকে একটু দূরে।”
“ও
আচ্ছা।”
“আমি
একটু একটু তেলেগু জানি।”
“কি
করে”
“আরে
আই.আই.টি খড়গপুরে আমার এক
তেলেগু বান্ধবীকে আমার খুব পছন্দ ছিল। তাকে ইমপ্রেস করার জন্য শেখার চেস্টা
করেছিলাম। কিন্তু তোমাদের ঐ জটিল ভাষাও শিখতে পারলাম না, ওদিকে আমার বান্ধবীও
আমাকে পাত্তা দিল না.........।”
“হা
হা”, হেসে ফেলল মোহিনী। হাত বাড়িয়ে বলল - “ফ্রেন্ড?”
“একদম”,
হ্যান্ডশেক করতে করতে বলল দীপক।
প্রতিদিনই
বিকেলে দেখা হতে থাকল তাদের। আই.আই.টি তে ঘোরার জায়গার অভাব নেই। দীপকের সহজ সরল স্বাভাবিক নেচার, আর মোহিনীর
শান্ত দৃঢ়তা কয়েকদিনের মধ্যেই পরস্পরকে ভাল বন্ধু বানিয়ে দিল।
কোনদিন
আইসক্রিম, কোনদিন জুস খেতে খেতে মাঠে বসে গল্প করত ওরা। খুব সাধারন কথাবার্তা। এই
ছোটবেলায় কেমন করে মোহিনী মাকে জ্বালাতন করত, বা কলেজ লাইফে দীপক কার কার প্রেমে
কেমন করে পড়েছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি ...। সময়গুলো খুব সুন্দর কেটে যেত। এই সুন্দর সময়গুলোর জন্যই হয়ত
আমরা বেঁচে থাকি...............।
মোহিনী
খেয়াল করেছিল দীপকের মধ্যে একটা চাপা দুঃখ আছে। কখনও কখনও কেমন যানি উদাস হয়ে যায়।
একদিন প্রশ্নটা করেই ফেলল -
“আচ্ছা
দীপক, তোমার মনে এই চাপা কষ্টটা কি বলবে?”
“শুনতে
চাও। শোন”
দীপক
বলে গেল তার কলেজ জীবনের প্রেমের কথা। কেমন করে প্রেম তৈরি হল, কেমন করে কয়েকমাস
খুব সুন্দর কাটল, আর কেমন করেই বা ঝামেলা শুরু হতে হতে সেই প্রেম কেটে গেল......
সবই।
মানুষ
প্রাণ খুলে নিজের দুঃখের কথা বলে তখনই যখন শ্রোতা তার দুঃখ অনুভব করে। মোহিনী
প্রায় চোখের পলক না ফেলে শুনছিল দীপকের কথা।
“এই
হল আমার কাহিনী। প্রিয়াঙ্কা আমাকে ছেড়ে গেছে...... কিন্তু যাবার সময় সে যে জীবনের
প্রতি আমার ভালোবাসাও খানিকটা কেড়ে নিয়ে গেছে.................” বলে দীর্ঘশ্বাস
ছাড়ল দীপক।
তখন
প্রায় রাত্রি আটটা বাজে। মোহিনী বলল – “ডিনার করে এখানেই ফিরে এস, কেমন?”
“ঠিক
আছে”, দীপক উত্তর দিল।
রাত্রি
নয়টার দিকে দুজনে আবার একসঙ্গে হল। বিশেষ কোন ভূমিকা না করে মোহিনী বলল – “তোমার
কথা শুনলাম, এবার আমার কথা শোন।”
বিয়ের
আগের ঘটনা আমারা আগেই শুনেছি। এবার তারপর কি হল দেখা যাক।
“বিয়ের
ঝামেলা মেটার কয়েকদিন পরেই আমার বি.এস.সি ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে ছুটি পড়ে। আমি বাড়ি ফিরে
আসি। আর তার পরের দিনই আমার বাড়িতে একটা ফোন আসে।”
“হ্যালো,
থিরুম্মা বাবু বলছেন?”
“হ্যাঁ,
বলছি”
“আপনি
কি জানেন, আপনার মেয়ে বিবাহিতা।”
“না”
“বিশ্বাস
করেন?”
“আপাতত
করছিনা, মোহিনী নিজের মুখে বললে করব”
“ঠিক
আছে, জেনে রাখুন আপনার মেয়ে মাওবাদী ছাত্রনেতা কৃষ্ণানের বিবাহিতা স্ত্রী। আর সে
নিজেও আমাদের সংগঠনের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কৃষ্ণান কিছুদিনের মধ্যেই ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে
চলে যাচ্ছে। এই অবস্থায় আমি আপনাকে অনুরোধ করছি যে আপনি আপনার মেয়েকে কৃষ্ণানের
সঙ্গে যেতে দিয়ে তাকে স্ত্রীর কর্তব্য করতে দিন।”
“আমি
বাবার কাছে সব সত্যি কথা স্বীকার করলাম। বিশ্বাস কর দীপক, এরকম হওয়ার কথা ছিল না।
পার্টি থেকে আমাকে promise করা হয়েছিল যে আমাদের বিয়ের
কথা কেউ জানবে না। কিন্তু সেই সিনিয়র পার্টি কমরেডই যখন বাবাকে এরকম কথা বললেন আমি
অবাক হব, না প্রচন্ড রেগে যাব, না জলে ঝাঁপ দেব –কিছুই বুঝতে পারলাম না।”
“তারপর
বল” দীপকের কৌতুহল আর তর সইছিল না।
“বাবা-মা
প্রচণ্ড কষ্ট পেলেন। জীবনে প্রথমবার আমি আমার বাবাকে কাঁদতে দেখলাম। আমাকে বললেন
কৃষ্ণানকে ফোন করে এর কারণ জিগ্যেস করতে।”
“কৃষ্ণান
কি বলল?”
“কৃষ্ণান
যা বলল তার সারমর্ম এই যে সে আমাকে এতটাই ভালবাসে যে আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না,
বিয়ের আগে থেকেই সব কিছু প্ল্যান করে রেখেছিল। আমি রাজী হব না বলে আমাকে প্ল্যানের
শেষ পার্ট টা, মানে বাড়িতে ফোন করার ব্যপারটা, আমার কাছ থেকে গোপন করা হয়।”
“তুমি
কি করলে?”
“আমি
confused হয়ে পড়লাম। একবার ভাবলাম সবকিছু ছেড়ে চলে যাই কৃষ্ণানের
কাছে জঙ্গলে। আবার ভাবলাম, আমার জীবন মিথ্যা দিয়ে শুরু হল কেন? কেন বিয়ের সময় আমাকে
সত্যি কথা বলা হল না......চিন্তার জালে জড়িয়ে যেতে থাকলাম আমি............আর সেই
সঙ্গে বাড়িতে আসতে লাগল ফোনের পর ফোন............অনুরোধ আস্তে আস্তে হুমকিতে পরিণত
হতে থাকল..............”
“তারপর?”
“কয়েকদিন
বাড়িতেই বসে রইলাম। আমার বাবা-মা আমাকে পূর্ন স্বাধীনতা দিল, নিজের জীবনের
সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার। কিন্ত অবশ্যই কেউই চায়নি যে আমি মাওবাদীদের দলে মিশে
জঙ্গলে চলে যাই। কৃষ্ণান আমাকে একদিন ফোন করে বলল, সে চলে যাচ্ছে, আর তার কাছে
মোবাইল থাকবে না। আমার যেদিন যেতে ইচ্ছা করবে, সেদিন যেন আমি সিনিয়র কমরেড
মোহন্তকে ফোন করি।”
“বিশ্বাস
কর দীপক, তারপর প্রায় এক বছর কেটে গেছে। আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি যে আমি কি করব।
এর মধ্যে আমি M. Sc তে ভর্তি
হয়েছি......পার্টি কমরেডদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বন্ধ না হলেও অনেকটা কমে গেছে।
আমাকে এখন শুধু ছাত্রীদের মাঝে ক্যাম্পেন করতে বলা হয়, পার্টি মিটিঙে প্রায় ডাকা
হয় না বললেই চলে। মাঝে মাঝে আমাকে কৃষ্ণানের গতিবিধি জানানো হয়, আর বলা হয় – চলে
যাও, চলে যাও ওর কাছে।”
রাত্রি
প্রায় বারোটা বাজে। দুজনে পরস্পরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। দিনের ব্যস্ত IIT Campus এ রাত্রের নিরবতা নেমে এসেছে।
দীপকই প্রথম কথা বলল –
“এত কিছুর পরও তুমি স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে
যাচ্ছ! পড়াশুনা করছ, আবার Summer Project করতেও এসেছ!”
“হয়ত
জীবনকে এখনও ভালবাসি বলে...” আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল মোহিনী।
“
অনেক রাত হয়ে গেছে। আজকে আসি। কাল ছটার সময় এস।” বলে বিদায় নিল
দীপক।
পরদিন
দুজনে প্রায় একই সঙ্গে মাঠে এসে বসল। সূর্য সবেমাত্র লাল হতে শুরু করেছে। মাঠের
চারপাশের কৃষ্ণচূড়ার রঙও লাল। সেই লালের দিকে তাকিয়েই দীপক কথা শুরু করল -
“আচ্ছা,
তোমার কেন মনে হয় যে মাওবাদীদের বেছে নেওয়া পথই সমাজ পরিবর্তনের একমাত্র পথ?”
“কারন
সমাজ পচতে পচতে এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে সময়ের সাধারন গতিতে একে change করা সম্ভব নয় বলে।”
“তুমি
কি করে বুঝছ, যে সমাজের খুব খারাপ অবস্থা?”
“বুঝছি এই জন্য যে সমাজের বেশীরভাগ লোক যখন ভাল করে খেতে
পায় না, তখনও যাদের কাছে টাকা আছে, তারা সেই গরীবমানুষদের জন্য একটুও না ভেবে
হাজার হাজার টাকা খরচ করে ক্রিকেট খেলে দেখতে যাচ্ছে, ব্যঙ্ককে মার্কেটিং করতে
যাচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি......এই Capitalist সমাজ
আমাদের স্বার্থপর হতে শেখায়, আর সেইসঙ্গে শেখায় কোন কিছুতেই সন্তুষ্ট না হতে। তাই
এই system এ কোন ভাল কিছু হওয়া সম্ভব নয়।”
“কিন্তু alternative Russia model তো
ব্যর্থ। তুমি কি China model কে Ideal করছ।”
“বলতে পার।”
“কিন্তু China আর India-র মধ্যে Social economical আর cultural কতটা পার্থক্য আছে সেটা ভেবে দেখেছ কি? আর সেই Difference এর গুলোর জন্য China model India তে কতটা প্রযোজ্য হবে সেটাও একবার ভাব।”
“প্রলেতারিয়েত; মানে যাদের হারাবার মত সম্পত্তি কিছু নেই;
তাদের কোন দেশ হয় না। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাই মানুষের cultural define করে।”
“তাহলে একই কারখানার একই মাইনে পাওয়া শ্রমিক, কেউ লতা
মঙ্গেশকরের গান শোনে, আর কেউ রাত্রে মদ খেয়ে এসে বউকে পেটায় কেন? তুমি পলিটিক্স
করেছ, এই ঘটনা যে ঘটে সেটা নিশ্চয়ই তুমি খেয়াল করেছ।”
“হ্যাঁ, তোমার এই পয়েন্টা ঠিক বটে...”
“Economy cultural কে effect করে অবশ্যই, কিন্তু সেটাই একমাত্র ফ্যাক্টর নয়। Education; মানে অবশ্যই স্কুল কলেজের formal Education-এর কথা বলছি না; একটা বিশাল বড় ফ্যাক্টর। আর জীবনকে এক এক
জন এক এক ভাবে দেখে। তাই কোন গরীব মানুষও সুখী হয়, আবার কোন কোটিপতিরও মনে শান্তি
থাকে না।”
“এসব তো অনেক পুরনো কথা। কিন্তু এসব বলে খেটে খাওয়া মানুষের
প্রাপ্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করাকে Justify করবে কি
করে?”
“আমি একদম Justify করছি না,
কিন্তু সেই পাওনা কিভাবে তাদের কাছে পৌঁছানো যায়, সেটার জন্য যে মডেল মাওবাদীরা
নিতে চলেছে শুধু সেই মডেলকে criticize করছি মাত্র। হাজার হাজার
মানুষের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে সমাজ পরিবর্তন করা যায় কি?”
“বিপ্লব করতে গেলে কিছু রক্তপাত হবেই। কিছু করার নেই। আর
গণতান্ত্রিক উপায়ে যারা এককালে বিপ্লবের কথা বলেছিল, তারা ভারতবর্ষের একটা রাজ্যের
কি হাল বানিয়েছে দেখতেই পাচ্ছি। আশা করি সেটাকে তুমি অস্বীকার করবে না।”
“সম্পুর্ণ স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু একই সঙ্গে তোমার
ছোটবেলায় তোমার গ্রামের অবস্থা যেমন ছিল, আর আজ তোমার গ্রাম কি অবস্থায় আছে একবার
মনে মনে ভাব দেখি।”
মোহিনী সেটা যে আগে ভাবেনি এমন নয়। 1991 এর economic liberalization এর প্রভাব
আজকের দক্ষিন ভারতে যথেষ্ট। আস্তে হলেও গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতে একটা জোয়ার আসছে
সে বিষয়ে পার্টি মিটিঙেও আলোচনা শুনেছে কয়েকবারই। সেখানে যে পয়েন্টগুলো উঠে এসেছিল
সেগুলোই বলার চেষ্টা করল সে –
“এগুলো ক্যপিটালিষ্টদের দের চালাকি। ছিটেফোঁটা ভাগ দেওয়া
হয়, আর তার বেশীরভাগটাই নতুন নতুন form of entertainment বের করে আবার চুষে নেওয়া হয়। আর সাধারন মানুষ ভাবে কি
আনন্দেই না আছি।”
“আচ্ছা, আনন্দের কি কোন Proper Definition আছে? তুমি সাধারন মানুষের জন্য বিপ্লব করবে ভেবে খুশী হও,
রাহুল Physics পড়ে খুব আনন্দ পায়, প্রেম সিং নতুন নতুন জামা কিনে আনন্দ
পায়, আবার আমার এক ক্লাসমেট প্রেরণা নতুন নতুন ছেলেদের সঙ্গে ছক করে খুব মজা পায়।
কোনটাকে Real আনন্দ আর কোনটাকে virtual আনন্দ
বলবে? হ্যাঁ ব্যাবসায়ীরা চাইবে যাতে লোকে তাদের Product কিনে
আনন্দ পায়, কারণ তাতে তাদের লাভ। একইভাবে আমার বাবা চায় যাতে ছেলেরা বাবার পড়া
শুনে আনন্দ পায়, যদিও তাতে বাবার মাইনে বেড়ে যায় না, কিন্তু বাবার অন্তরে এক
অন্যরকম আনন্দ হয়। তুমি Physics এর ছাত্রী, পৃথিবীর
প্রত্যেকটা মানুষই প্রতিটি মুহূর্তে তার নিজের নিজের Reference Frame থেকে ঠিক থাকে, সেটা কি তোমাকে বোঝাতে হবে? আমরা সবসময়ই
আমাদের অতীতকে শোধরাই, সবাই বলে আমি ভুল ছিলাম, বা আমার stand point ভুল ছিল। আমি এই মুহূর্তে ভুল, সেটা কেউ বলে কি?”
মোহিনীর কাছে এই কথাগুলো সম্পুর্ণ নতুন। সে রাত্রে সে
সত্যিই সবকিছুকে একবার নতুন করে ভাববার চেষ্টা করল।
পরদিন ভরাট গলায় দীপক আবার বলছে – “জঙ্গলে মাইন পেতে রেখে
সাধারণ কয়েকটা কনেস্টবলকে মেরে বিপ্লবের ভান তুমি করতেই পার মোহিনী, কিন্তু ভাব তো
তোমার গ্রামে ভাল টিচারের কত অভাব! একটা ভাল টিচার তোমার গ্রামকে পুরো বদলে দিতে
পারে! ভাব একজন ভাল ডাক্তার কেমন করে একটা পুরো এলাকার মানুষকে সুস্থ থাকতে
সাহায্য করতে পারে! ভাব একটা University –র একটা ভাল Physics এর Professor কিভাবে বছরের পর বছর কত কত
ভাল ছাত্র তৈরী করেন! Do something constructive Mohini which
will have some definite output! তুমি
বলবে এটা আমার Middle class sentiment, আর আমি যা দেখছি তার বাইরে
কোন সাহসী ভাবনা ভাবতে পারি না। কিন্তু তার উত্তরে আমি বলব যে, যেটা তুমি সাহসী
ভাবনা বলছ, সেটা আর কিছুই না কল্পনা বিলাসিতা। যতটুকু ইতিহাস, সমাজবিদ্যার জ্ঞান
আমার আছে মোহিনী তাতে করে আমি বলব ভারতের এখন বিপ্লবের সময় নয়, এখন ভারতকে গড়ে
তোলার সময়। তোমরা Liberalization এর সময় অনেক warning দিয়েছিলে, কিন্তু সেগুলো তো ফলে নি। Computer - Information Technology industry কতগুলো job নষ্ট
করেছে, আর কতগুলো তৈরী করেছে সে হিসাব আজ জলের মত পরিষ্কার। ভারতকে এগিয়ে নিয়ে
যেতে সাহায্য কর মোহিনী - যতটুকু সম্ভব।
ইতিহাসের স্বাভাবিক গতির বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ সফল হয়নি। ভারতের মাওবাদীরাও হবে না।”
সে রাত্রে মোহিনী স্বপ্ন দেখল –--- সে নিচ থেকে তালপাতা
ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে, আর দীপক ঘরের চাল ছাইছে। ঘর তৈরী হয়ে গেলে দীপক নিচে নেমে এসে
বলল – দেখ কেমন সুন্দর একটা ঘর বানালাম -
মোহিনী দেখল দূর থেকে অনেক অনেক মানুষ দৌড়ে দৌড়ে আসছে – দীপক মোহিনীর হাত ধরে বলল
– চল এখনও অনেক কাজ বাকি.........
মানুষের মনের দেওয়াল যত শক্তই হোক না কেন, তেমন জোরালো আঘাত
লাগলে হয়ত ভেঙেই পড়ে। দীপকের যুক্তি না পার্সোনালিটি, কোনটা মোহিনীকে বেশী প্রভাবিত
করেছিল তার উত্তর মোহিনীই দিতে পারবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মোহিনী হার মানল। তারপরেও
বেশকিছুদিন তারা রোজই সন্ধ্যার পর অনেক অনেক কথা বলত...দীপকের জীবনের ভবিষ্যত
পরিকল্পনা, মোহিনীর আগামীদিনে কি করণীয়, কৃষ্ণান – মোহিনীর সম্পর্কের ভবিষ্যত কি
কি ইত্যাদি ইত্যাদি যেগুলোর বিস্তারিত বিবরন দেবার কোন প্রয়োজন নেই। এটুকু বলাই
যথেষ্ট যে মোহিনী বাকি জীবন একজন খুব ভাল Professor হয়ে
কাটানোই স্থির করল। আর কৃষ্ণানের সঙ্গে divorce? চেষ্টা
করবে - তবে সেটা তো তার একার হাতে নেই – আরও অনেক factor আছে।
সময়ের কাঁটা থেকে থাকে না। বিদায়ের দিন এসেই গেল। বাড়ি
যাবার আগেরদিন রাত্রে মোহিনী দীপককে বলছে – “তুমি ২ মাসে আমার জীবনকে বদলে দিলে
দীপক, জীবনকে নতুন ভাবে দেখতে শেখালে। তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ছোট করব না। শুধু
একটা অনুরোধ করব, রাখবে?”
“বল।”, দীপকের গলা কি ভিজে ভিজে?
“তোমার হাতটা একটু ধরতে দেবে Please...”
পরস্পরের হাত ধরে অনেক-অনেকক্ষন বসে রইল তারা। ঠোঁটে ঠোঁট
মিললে তাদের অনুভূতি আরও গভীর হোত কিনা আমি জানি না, কিন্তু হাতে হাত রেখেই তারা একে
অপরকে গভীরভাবে অনুভব করেছিল .........
এয়ারপোর্টে দীপককে মোহিনীর শেষ কথা – “দীপক, আবার কবে দেখা
হবে জানি না, কিন্তু এমন দিন যেন অবশ্যই আসে, যেদিন আমরা পরস্পরের প্রতি গর্ব
অনুভব করতে পারি।”
সেই দিন আসতে অনেক দেরি আছে, তবে নিজের নিজের জীবনে এখনও
পর্যন্ত তারা যথেষ্টই সফল।

Character er kothao kothao author er characteristics paoa jachhe :-) Literature er etai moja ..
ReplyDeleteHain, seta ekdom thik......
ReplyDeletelekhar style ta sotti khub valo.. content niye natun kore kichhu bolar nei! :)
ReplyDelete